মরিয়ম মির্যাখানির দেশে ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড

মরিয়ম মির্যাখানির দেশে ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড

ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ

অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

২৩ আগস্ট ২০১৭, সময় - ১৯:১৩


প্রতিযোগিতার সময় আইওআই-এর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে। ছবি: লেখক

একবিংশ শতাব্দীতে গোটা বিশ্ব জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংকল্পবদ্ধ। আমরাও বাংলাদেশে ডিজিটাল বাংলাদেশের অত্যন্ত যুতসই শ্লোগানের লক্ষে বদ্ধপরিকর। দেরিতে হলেও জ্ঞানভিত্তিক নানা প্রতিযোগিতায় আমাদের তরুণ সম্প্রদায় প্রায় বছর বিশেক যাবত অংশগ্রহণ করছে । এ সকল কঠিন চ্যালেঞ্জ আমাদের ছেলেমেয়েরা সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছে । এবার আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের কঠিন আসরে দেশভিত্তিক র‍্যাংকে আমাদের অবস্থান ২৬, পক্ষান্তরে ভারতের ৫২। আমাদের দুইটি করে সিলভার ও ব্রোঞ্জ মেডাল। পদার্থ বিজ্ঞানের অলিম্পিয়াডে একটি সিলভার ও তিনটি ব্রোঞ্জ মেডাল। ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের তিনজন স্কুল ছাত্র তাসমীম রেজা, রুহান হাবিব এবং রুবাব রেদওয়ান এবং নটরডেম কলেজের যুবায়ের রহমানের যাত্রা মরিয়ম মির্যাখানির দেশ ইরানে।

ইরান জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তার অবস্থান সুদৃঢ় করেছে বেশ আগেই। প্রতিটি অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক প্রাপ্তি ঘটছে অহরহ। শুধু তাই নয় এ প্রতিযোগিতা সম্পর্কে এমনকি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের ধারণাও ভাল। তাছাড়া এ প্রতিযোগিতার বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপও ইরান একাধিকবার আয়োজন করেছে। এবার করছে আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড। এই প্রতিযোগিতায় ইরান এ বছরের পূর্ব পর্যন্ত ২১টি স্বর্ণপদকসহ ৯০টির বেশি পদক জিতেছে।

এবারের আয়োজন আমার দেখা সকল ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। দলনেতাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে পার্সিয়ান আজাদি হোটেলে, প্রতিযোগীদের জন্য অদূরে অবস্থিত এভিন হোটেল। দুটিই তেহরান শহরের উত্তরে পাহাড় ঘেঁষে দামি জায়গায়। অনেক দর্শনীয় স্থানে যাওয়ার সুযোগ ছিল যার মধ্যে মিলাদ টাওয়ার, যা ইরানিদের দৃঢ়তার প্রতীক, দৃষ্টিনন্দন ওয়াটার অ্যান্ড ফায়ার পার্ক। আমাদের দল তেহরান ও শরিফ বিশ্ববিদ্যালয় দেখেছে, ইরানিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে।

ইরানের অনেক ঠিকানা, সাদির দেশ ইরান, ওমর খৈয়ামের দেশ ইরান, হাফিযের দেশ ইরান, জালালুদ্দিন রুমির দেশ ইরান। কম্পিউটার বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো এলগরিদম, এই নামের সূচনাও কিন্তু পারস্যের গণিতবেত্তা ও জ্যোতির্বিদ আল খারিজমির নাম থেকে এসেছে, যেমন হয়েছে এলজেবরা শব্দের উৎপত্তি আলখারিজমির বই ইলম আল জাবর ওয়াল মুকাবালা থেকে। এরপরও আমার শিরোনাম কিছুটা ভিন্ন, কিন্তু বর্তমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন শাস্ত্র কিংবা জীববিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার থাকলেও গণিত কিংবা কম্পিউটার বিজ্ঞানে এই পুরস্কার নেই। কানাডিয়ান গণিতজ্ঞ জন চার্লস ফিল্ডসের অর্থায়নে ১৯৩৬ সালে গণিতের নোবেল পুরস্কার খ্যাত এই পুরস্কারটির সূচনা । এখন প্রতি চার বছরে দুই, তিন কিংবা চারজন অনূর্ধ্ব চল্লিশ বছর বয়সী বিজ্ঞানীকে এই পুরস্কার দেয়া হয়। ২০১৪ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম বারের মতো এই পুরস্কার একজন ইরানি নারী গণিতজ্ঞ পান যার নাম মরিয়ম মির্যাখানি। তার গবেষণার বিষয়বস্তু এতটাই জটিল ছিল যে, সেক্ষেত্রটি শক্তিশালী পুরুষ গণিতবেত্তারাও এড়িয়ে চলত। অবশ্যই প্রথম নারী ফিল্ডস মেডাল বিজয়ী হিসেবে তিনি বহুবার শিরোনাম হতেই পারেন। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে স্ট্যানফোর্ডের এই অধ্যাপকের গত ১৪ই জুলাইতে মহাপ্রয়াণের ঘটনা।

বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের জন্য ইরানের রক্ষণশীল সরকার কিংবা সমাজ সম্ভবত তা সুনজরে দেখেনি যদিও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ইরানি নাগরিক মরিয়ম মির্যাখানির যাতায়াত ছিল নিয়মিত। তার বিশ্ববিদ্যালয় শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির সঙ্গে যোগাযোগ ছিল নিবিড়। প্রযুক্তির বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্বেও গণিতসহ টেকনোলজির বাইরে অন্যান্য বিষয়ও সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। গণিতের লাইব্রেরি সবচেয়ে বড় এবং সেই লাইব্রেরির নামকরণ করা হয়েছে মির্যাখানির নামে। স্বতস্ফূর্ত গণশোক হয়েছে নানা পার্কে এবং গুরুত্বপূর্ণ অডিটোরিয়ামে। তার নামে রাস্তার নামকরণ করা হবে, তার মেয়েকে কীভাবে ইরানি নাগরিকত্ব দেওয়া যায় তা নিয়ে আইন পাশ হবে পার্লামেন্টে। বিজ্ঞানের প্রতি ইরানিদের যে ভালবাসা তা টের পেলাম ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে এসে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীদের ছবিসহ আবিষ্কারের নানা তথ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে তোরণ, যাতে কোনো বিদেশির দৃষ্টি না এড়ায়। এক মেয়ে স্বেচ্ছাসেবককে জিজ্ঞাসা করলাম মির্যাখানিকে চেনে কিনা। অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করল আমরা একই বিভাগের ছাত্রী। শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিকে ইরানের এমআইটি বলা হয়। রাজধানীতে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই মির্যাখানি পাশ করেছে। স্থাপত্যের আইনস্টাইনখ্যাত এফ আর খান আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের স্নাতক, বাড়ি ফরিদপুর, পড়ালেখা বেশিরভাগই বাংলাদেশের মাটিতে। ১০০ তলা জন হ্যানকক সেন্টার এবং ১৯৭৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত সময় পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ইমারত ১১০ তলা সিয়ার্স টাওয়ারের ডিজাইনার এফ আর খানের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিকাগো শহরের দুইটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মিলনস্থল নামকরণ করা হলেও তার নিজের দেশে কিছু নেই। কী অভাগা আমাদের দেশটি। শ্রেষ্ঠ সন্তানকে অস্বীকার করার এই কৃষ্টি ঐতিহ্য থেকে কবে আমরা বের হয়ে আসতে পারব? বিদেশিকে বিয়ে করে রক্ষণশীল সমাজের বিরূপ মনোভাব থেকে বের হয়ে এসে ইরানের সমাজ এবং সরকার যেভাবে মির্যাখানিকে ভালবাসায় আলিঙ্গন করেছে আমাদের চরিত্রের এই উন্নতি কবে হবে। যে দেশে গুণীর কদর নেই সেদেশে গুণী মানুষ জন্মায় না। এমনকি এই অলিম্পিয়াডেও আমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন প্রোগামিং প্রতিযোগিতা করা স্বাস্থ্যগত কারণে হুইলচেয়ারের বাসিন্দা অধ্যাপক ঘোদসীকে যে সম্মান জানানো হলো তাতে অভিভূত হয়ে গেলাম।


ইরানি বিখ্যাত নারী গণিতজ্ঞ মরিয়ম মির্যাখানি। ছবি: সংগৃহীত

যা হোক এবার ফিরে আসি ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে। ২০০৪ সালে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের নেতৃত্বে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে বাংলাদেশ ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড গঠিত হয়েছিল। আমাদের এই উদ্যোগে নানা সময়ে নানা প্রতিষ্ঠান সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে যার মধ্যে সুফি আলহাজ মিজানুর রহমান চৌধুরীর পিএইচপি গ্রুপ, ইন্টারন্যাশনাল, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, জনতা ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি এবং বিগত তিন বছর ধরে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নেতৃত্বে আইসিটি ডিভিশন অন্যতম। বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সকল অলিম্পিয়াড থেকে প্রথম যে সিলভার মেডাল আসে তা হলো ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড থেকে আবিরুল ইসলামের হাত ধরে বুলগেরিয়া থেকে। ২০১২ সালে বৃষ্টি সিকদার ইতালিতে অনুষ্ঠিত আইও আইতে ব্রোঞ্জ মেডালসহ সারা বিশ্বের মেয়েদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। এবার আমাদের প্রত্যাশা বেশি ছিল। আমাদের ক্ষুদে প্রোগ্রামাররা কিছুটা অভিজ্ঞতা-সমৃদ্ধও ছিল। গত বছর রাশিয়ার কাজান শহরে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তারা দুইটি ব্রোঞ্জ মেডাল পেয়েছিল। এছাড়া দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিযোগিতায় এই ক্ষুদে কম্পিউটার প্রোগ্রামাররা সব সময়ই তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল হয়নি। তবুও এই সম্ভবত প্রথম যে আমাদের দেশের অলিম্পিয়াড দলের প্রত্যেকেই একটি করে পদক জিতেছে। আমরা চারটি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছি আর ভারত পেয়েছে তিনটি। আমাদের গণিত অলিম্পিয়াড দলও ভারতকে পিছনে ফেলে দুইটি সিলভার ও দুইটি ব্রোঞ্জ মেডাল জিতেছে। ৮৪টি দেশের ৩০৮ জন প্রতিযোগীর সঙ্গে আয়োজক দেশের আরও চারজন। পাঁচ ঘণ্টার প্রতিযোগিতায় আমাদের তাসমীম রেজা সিলভার মেডাল পাওয়ার মতো অবস্থানেই ছিল। প্রতিযোগিতাকালীন আধ ঘণ্টা সময় বাড়িয়ে দেওয়াতেই যত বিপত্তি। অন্য দেশের ছেলেমেয়েরা তাদের স্কোর বাড়াতে পারলেও তাসমীমের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমাদের আশা ছিল স্বল্পভাষী দৃঢ়প্রত্যয়ী তাসমীম এবার সিলভার মেডাল পাবে, অন্যান্যরাও আরও ভাল করবে । আমাদের যেতে হবে অনেক দূর। যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম স্বর্ণ জয় করেছে, ইরান, কোরিয়া ও ব্রাজিল স্বর্নপদক জিতেছে। আমাদেরও জিততে হবে।

আমাদের দলনেতা বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান দলের জন্য সকল ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে শেষ মুহূর্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য যেতে পারেননি। খুবই আনন্দের বিষয় আমাদের স্নাতক জিসান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে ইরানের বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করায় কাউন্সিলর জনাব মোমেনুল হক তদীয় পত্নীসহ বিমানবন্দরে আমাদের সাদর সম্ভাষণ জানানোতে আমরা দারুণ উৎফুল্ল ছিলাম। পরবর্তীতে হক সাহেব দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন এবং আমাদের মাননীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থাও করেছেন। বেগম হক দলের জন্য স্বীয় বাসভবনে একটি ডিনার পার্টির আয়োজন করে সবাইকে বাংলাদেশি হিসেবে গর্বিত করেছেন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলো এ ধরনের অনুষ্ঠানে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে দেশের উন্নততর ভাবমূর্তি তৈরিতে অবদান রাখবে এটাই সকলের প্রত্যাশা।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

 

 

Download from BIGTheme.net free full premium templates